এতে করে বিশ্ববাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে এশিয়ার বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে চার মাসের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। আকস্মিক এ সংকটে বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস আমদানির জন্য ক্রেতা দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এতে বাংলাদেশসহ জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য আসন্ন শীত মৌসুমে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস ও আনাদোলু এজেন্সি।
গত বুধবার উত্তর-পূর্ব এশিয়ার স্পট মার্কেট বা খোলাবাজারের এলএনজি সরবরাহের প্রধান মানদণ্ড জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) একদিনেই প্রায় ১৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেড়ে যায়। এদিন প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজির দাম দাঁড়ায় ১৯ ডলার ৯৩ সেন্টে। গত এক মাসে এশিয়ার স্পট মার্কেটে গ্যাসের দাম বেড়েছে ২৫ শতাংশের বেশি। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এ রুট দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে প্রণালিটি বন্ধ বা সংকুচিত হওয়ায় সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে কাতারের ওপর। দেশটির এলএনজি রফতানির সব জাহাজকে এ সংকীর্ণ জলপথ পার হয়েই বিশ্ববাজারে যেতে হয়। ফলে নিয়মিত সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো এখন বিকল্প হিসেবে স্পট মার্কেট থেকে জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি কেনার চেষ্টা করছে। এতে খোলাবাজারে প্রতিযোগিতা ও দাম দুটোই হুহু করে বাড়ছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ গ্যাসের চাহিদার একটি বড় অংশ মেটাতে আমদানীকৃত এলএনজির ওপর নির্ভর করে। স্পট মার্কেটে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম ২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়। এতে করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ওপর চরম আর্থিক চাপ তৈরি হবে। তাছাড়া সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি বা বৈদেশিক মুদ্রাও গুনতে হতে পারে।
এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) একেএম মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম বাড়ছে এটা পেট্রোবাংলা পর্যবেক্ষণ করছে। তবে গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে এ মুহূর্তে এলএনজি আমদানির বিকল্প নেই। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও ১১৫ কার্গো এলএনজি কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। পেট্রোবাংলা চায় গ্যাসের যাতে কোনো ঘাটতি না হয়। এজন্য সরকারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ভর্তুকির অর্থও পাওয়া যাচ্ছে।’
অন্যদিকে ইউরোপের দেশগুলোও এ পরিস্থিতি নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। বর্তমানে সেখানে গ্যাসের মজুদ রয়েছে মাত্র ৫০ শতাংশের কিছুটা বেশি, যা স্বাভাবিক সময়ে ৬০ শতাংশের ওপরে থাকে। যদিও দেশগুলো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নতুন গ্যাস প্রকল্পের মাধ্যমে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামলে নিয়েছিল, কিন্তু মজুদ এখনো আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এ সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং আগামী শীতকালে এশিয়া ও ইউরোপে তীব্র ঠাণ্ডা পড়ে, তবে এলএনজি নিয়ে দুই মহাদেশের মধ্যে কাড়াকাড়ি শুরু হবে। ফলে এলএনজির দাম এতটাই বাড়বে যে সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বিলের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।